NewsOfEarthForAll

“আপনার মস্তিষ্ক অপমান ২০ বছর ধরে মনে রাখতে পারে, কিন্তু প্রশংসা ৩০ দিনেই ভুলে যায়”

November 3, 2025 7:00 pm

মানুষের মস্তিষ্ক এক আশ্চর্য জিনিস। এটি আমাদের সুখ, দুঃখ, রাগ, লজ্জা এবং ভালোবাসা—সব অনুভূতি সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু তুমি কি জানো, মস্তিষ্ক “অপমান” বা “নেতিবাচক অভিজ্ঞতা” অনেক দীর্ঘ সময় ধরে মনে রাখে, অথচ প্রশংসা বা ইতিবাচক ঘটনা দ্রুত ভুলে যায়?
এই বৈপরীত্য আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যা হাজার বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।


🧬 মস্তিষ্ক কেন অপমান বেশি মনে রাখে

নিউরোসায়েন্স বলছে, আমাদের মস্তিষ্কে একটি অংশ আছে যার নাম Amygdala (অ্যামিগডালা)। এটি মূলত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে।
যখন কেউ আমাদের অপমান করে বা নেতিবাচক আচরণ করে, তখন অ্যামিগডালা সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সেই অভিজ্ঞতাকে “বিপদের সংকেত” হিসেবে মস্তিষ্কে গভীরভাবে সংরক্ষণ করে রাখে।

অন্যদিকে, যখন কেউ প্রশংসা করে, তখন আমাদের মস্তিষ্কে “Dopamine” ও “Serotonin” নামের সুখ হরমোন নিঃসৃত হয়, কিন্তু এই হরমোনগুলোর প্রভাব অল্প সময়ের মধ্যেই কমে যায়। ফলে মস্তিষ্ক সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করে না।


🧩 মনোবিজ্ঞানীরা কী বলছেন

মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন “Negativity Bias” — অর্থাৎ, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৬০,০০০ চিন্তা করে, তার মধ্যে প্রায় ৮০% নেতিবাচক চিন্তা
কারণ, মস্তিষ্ক নেতিবাচক ঘটনার বিশ্লেষণে বেশি সময় ব্যয় করে, যাতে ভবিষ্যতে নিজেকে রক্ষা করা যায়।

তাই কোনো অপমানের ঘটনা আমরা ২০ বছর আগেও স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারি — কে, কোথায়, কীভাবে বলেছিল, সব!
কিন্তু কেউ আমাদের ৩০ দিন আগে প্রশংসা করলেও, তা দ্রুত হারিয়ে যায় স্মৃতির ভেতরে।


❤️ প্রশংসা কেন টেকে না

আমরা যখন প্রশংসা পাই, তখন মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে আনন্দে ভরে ওঠে।
কিন্তু প্রশংসা “বিপদ নয়”, তাই মস্তিষ্ক সেটাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না।
এটি আমাদের মানসিক নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং সামাজিক সন্তুষ্টির জন্য তৈরি প্রতিক্রিয়া।
তাই একে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ না করে মস্তিষ্ক নতুন তথ্যের জায়গা তৈরি করে নেয়।

অন্যদিকে, অপমানের স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে থাকা আমাদের আত্মরক্ষার এক প্রাচীন প্রবৃত্তি — যেন আমরা ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকতে পারি।


🧠 বিজ্ঞান যা বলছে

যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health (NIH)–এর গবেষণায় বলা হয়েছে, নেতিবাচক স্মৃতি “Amygdala–Hippocampus pathway” দিয়ে সংরক্ষিত হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়।
এ কারণে, কেউ যদি ২০ বছর আগে আপনাকে অন্যায়ের সঙ্গে অপমান করে, সেই অভিজ্ঞতার বেদনা আজও বাস্তবের মতো অনুভূত হতে পারে।

অন্যদিকে, প্রশংসা মস্তিষ্কে সাময়িক “Short-Term Reward Center”-এ জমা থাকে।
যদি বারবার প্রশংসা না পাওয়া যায়, তবে তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়।


🌿 কীভাবে প্রশংসা মনে রাখবেন এবং অপমান ভুলবেন

তবে সুখবর হলো — আমরা চাইলে মস্তিষ্ককে নতুনভাবে প্রোগ্রাম করতে পারি।
কিছু সহজ অভ্যাস গ্রহণ করলে প্রশংসা দীর্ঘস্থায়ী এবং অপমান ক্ষণস্থায়ী করা সম্ভব।

১️⃣ কৃতজ্ঞতা চর্চা করুন (Gratitude Practice):
প্রতিদিন রাতে তিনটি ভালো ঘটনার কথা লিখুন — কে আপনাকে প্রশংসা করেছে, কী ছোট সাফল্য পেয়েছেন, কীতে আনন্দ পেয়েছেন। এতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ইতিবাচক তথ্য বেশি সংরক্ষণ করবে।

২️⃣ ধ্যান ও সচেতনতা (Mindfulness):
নেতিবাচক চিন্তা এলে গভীর শ্বাস নিন, অনুভূতি পর্যবেক্ষণ করুন, প্রতিক্রিয়া নয়—সচেতনতা আনুন।

৩️⃣ ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করুন:
যাদের মধ্যে সর্বদা অভিযোগ, নেতিবাচকতা বা তুচ্ছতা—তাদের থেকে দূরে থাকুন। ইতিবাচক মানুষদের সঙ্গে সময় কাটালে মস্তিষ্ক প্রশংসা-ভিত্তিক স্মৃতি সংরক্ষণ করতে শেখে।

৪️⃣ নিজেকে প্রশংসা করুন:
অন্যের প্রশংসার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেকে বলুন, “আজ আমি ভালো কিছু করেছি।”
নিজের মস্তিষ্ককেই শেখান প্রশংসা ধরে রাখতে।


💡 মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন —

“একটি অপমানের স্মৃতি মুছতে হলে, অন্তত পাঁচটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হয়।”
অর্থাৎ, প্রশংসা ও ভালোবাসা যত বেশি পাবেন, ততই মস্তিষ্কের ভারসাম্য ফিরবে।

তাই, আজ থেকে শুরু করুন — প্রশংসা মনে রাখুন, অপমানকে মুক্তি দিন।

Leave a Reply