নদীর পাড়ে বসে কিশোর রফিক প্রথমবার গজার মাছটা দেখেছিল। তখন বর্ষাকাল, চারদিক জল থৈথৈ করছে। বুড়ো জেলেটা তার জাল তুলে ধরতেই সবাই যে মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, তার মধ্যে একটাকে দেখে রফিকের গা ছমছম করে উঠেছিল। লম্বা শরীর, সাপের মতো গড়ন, চোখে এক অদ্ভুত শীতল দৃষ্টি—মাছ হলেও যেন মাছ নয়।
রফিক তখন প্রশ্ন করেছিল,
— “কাকা, এইটা কি সত্যিই মাছ?”
বুড়ো জেলে হেসে বলেছিল,
— “এইটাই তো গজার মাছ রে! মাছ হয়েও যা মাছ না!”
এই প্রশ্নটাই—গজার মাছ কি আসলেই একটা মাছ, নাকি অন্য কিছু?—শুধু রফিকের নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামবাংলার মানুষের মনে ঘুরে বেড়িয়েছে।
১. গল্পের শুরু: গজারের রহস্য
গ্রামবাংলায় গজার মাছকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। কেউ বলে, এটা সাপের আত্মীয়। কেউ বলে, এটা পানির দানব। আবার কেউ বিশ্বাস করে, গজার মাছ নাকি পানির বাইরে কিছু সময় বেঁচেও থাকতে পারে—যা সাধারণ মাছের পক্ষে অসম্ভব।
রফিক বড় হতে হতে এই গল্পগুলো শুনেই বড় হয়েছে। তার দাদু বলতেন,
“গজার মাছ ধরা গেলে সাবধানে ধরবি। এ মাছ মরে না সহজে। মাছ হলেও এর মধ্যে অন্য কিছু আছে।”
এই “অন্য কিছু”-টাই যেন গজার মাছকে সাধারণ মাছের তালিকা থেকে আলাদা করে দেয়।
২. গজার মাছের পরিচিতি: নামেই রহস্য
গজার মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Channa striata। ইংরেজিতে একে বলা হয় Snakehead Fish। নাম শুনেই বোঝা যায়, এটি দেখতে অনেকটা সাপের মতো। লম্বা, নলাকার শরীর, বড় মুখ, ধারালো দাঁত—সব মিলিয়ে মাছ হলেও এর মধ্যে সরীসৃপের ছায়া স্পষ্ট।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে গজার মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ধানক্ষেত, খাল, বিল, পুকুর ও জলাভূমিতে এই মাছের আধিপত্য।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। গজার মাছের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—
👉 এটি বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নিতে পারে।
৩. মাছ হয়েও বাতাসে শ্বাস?
একদিন রফিক কলেজে পড়তে গিয়ে জীববিজ্ঞানের ক্লাসে শুনল, গজার মাছের শরীরে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যাকে বলা হয় Suprabranchial Organ। এই অঙ্গের সাহায্যে গজার মাছ পানির বাইরে থেকেও বাতাসে শ্বাস নিতে পারে।
এই কারণেই বর্ষা শেষে পুকুর শুকিয়ে গেলে গজার মাছ কাদার মধ্যে লুকিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে এক জলাশয় থেকে আরেক জলাশয়ে মাটির উপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যেতে পারে।
রফিক তখনই বুঝল—
গজার মাছ আসলেই সাধারণ মাছ নয়।
৪. লোককথায় গজার মাছ
গ্রামবাংলার লোককথায় গজার মাছ এক রহস্যময় চরিত্র। কেউ কেউ বিশ্বাস করে, গজার মাছের মধ্যে অলৌকিক শক্তি আছে। বিশেষ করে অসুখ-বিসুখে গজার মাছের ঝোল খাওয়ানো হয় রোগীকে।
দাদির মুখে রফিক শুনেছিল,
“অপারেশনের পর গজার মাছের ঝোল না খেলে ক্ষত শুকায় না।”
এই বিশ্বাসের পেছনেও আছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। গজার মাছের মাংসে প্রচুর প্রোটিন, কোলাজেন ও অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।
৫. গজার মাছ কি তবে সাপ?
অনেকেই প্রশ্ন করে—গজার মাছ কি সাপের মতো সরীসৃপ?
উত্তরটা সহজ: না, গজার মাছ সরীসৃপ নয়।
জীববিজ্ঞানের ভাষায়, গজার মাছ হলো—
- মেরুদণ্ডী প্রাণী
- ঠান্ডা রক্তবিশিষ্ট
- ফুলকা ও বিশেষ শ্বাসযন্ত্রযুক্ত
- ডিম পাড়া জলজ প্রাণী
এই সব বৈশিষ্ট্য একে নিঃসন্দেহে মাছ হিসেবেই চিহ্নিত করে। তবে এর অভিযোজন ক্ষমতা একে অন্য মাছদের থেকে আলাদা করেছে।
৬. গল্পের মোড়: বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস
রফিক একদিন তার দাদুকে বলেছিল,
“দাদু, গজার মাছ আসলে মাছই। শুধু একটু আলাদা।”
দাদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,
“বিজ্ঞান তার জায়গায় ঠিক আছে রে। কিন্তু প্রকৃতির সব রহস্য কি আর বইয়ে লেখা থাকে?”
এই কথাটাই যেন গজার মাছের পরিচয়ের আসল চাবিকাঠি।
৭. গজার মাছের স্বভাব ও জীবনচক্র
গজার মাছ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক শিকারি। ছোট মাছ, ব্যাঙ, কীট-পতঙ্গ—সবই এর খাদ্য। এরা সাধারণত একাকী চলাফেরা করে এবং নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে খুবই আগ্রাসী।
প্রজননের সময় স্ত্রী ও পুরুষ গজার মাছ একসঙ্গে ডিম পাহারা দেয়—যা মাছের জগতে বিরল ঘটনা। এই পিতামাতার যত্নই গজার মাছের বংশবিস্তারকে শক্তিশালী করেছে।
৮. আধুনিক সময়ে গজার মাছ
আজকের দিনে গজার মাছ শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরের বাজারে এর দাম বেশি। চাষের মাধ্যমেও গজার মাছ উৎপাদন হচ্ছে।
তবে কিছু দেশে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে, গজার মাছকে বিপজ্জনক আক্রমণাত্মক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এটি নতুন পরিবেশে ঢুকে অন্য মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
৯. তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী?
গল্পের শেষপ্রান্তে এসে রফিক নিজেই উত্তর খুঁজে পায়—
👉 গজার মাছ আসলেই একটি মাছ।
👉 কিন্তু এটি এমন এক মাছ, যার মধ্যে আছে সাপের মতো সহনশীলতা, স্থলচর প্রাণীর মতো শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা এবং শিকারির মতো বুদ্ধি।
এই কারণেই মানুষ বারবার প্রশ্ন করে—
“গজার মাছ কি আসলেই একটা মাছ, নাকি অন্য কিছু?”
১০. শেষ কথা: প্রকৃতির ব্যতিক্রমী সৃষ্টি
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রফিক আবারও সেই পুরোনো দিনের কথা মনে করে। গজার মাছ তখনও জালে ছটফট করছে—ঠিক যেমন হাজার বছর আগে করত।
প্রকৃতি যেন গজার মাছের মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
সবকিছু সরল নয়, সব পরিচয় এক লাইনে লেখা যায় না।
গজার মাছ মাছই।
কিন্তু সে মাছের চেয়েও বেশি কিছু।