NewsOfEarthForAll

স্বর্গীয় সৌন্দর্যের প্রতীক: ময়ূরের পেখমে লুকিয়ে আছে যে রহস্য ও সংস্কৃতি

8. ময়ূর – Peacock
December 10, 2025 7:00 am

ভূমিকা: এক ঝলকে মুগ্ধতা

ভোরবেলা নরম আলোয় ঝলমল করছে একটা সবুজ প্রান্তর। হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে এক তীক্ষ্ণ ডাক—কেকা ধ্বনি। আর তারপরই সে দৃশ্য! একটি পুরুষ পাখি, যা কেবল পাখি নয়, যেন সবুজ, নীল আর সোনালী রঙের জীবন্ত ক্যানভাস, তার রাজকীয় পেখম মেলে ধরেছে। আমি কথা বলছি ময়ূর (Peacock) নিয়ে। পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের দেখা মাত্রই আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই, তাদের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য আমাদের চোখ এবং মনকে এক লহমায় শান্তি এনে দেয়। ময়ূর তাদের মধ্যে অন্যতম।

ময়ূর কেবল একটি সুন্দর পাখি নয়; এটি সংস্কৃতি, ধর্ম, পুরাণ এবং ইতিহাসের এক গভীর প্রতীক। ভারত থেকে শুরু করে গ্রিস পর্যন্ত—সভ্যতার ইতিহাসে এই পাখিটি সর্বদা স্থান পেয়েছে রাজকীয়তা, গর্ব এবং অমরত্বের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু পেখমের এই ঝলমলে পর্দার আড়ালে ময়ূর জীবন কেমন? কেন সে পেখম মেলে ধরে? এই ব্লগ পোস্টে আমরা ময়ূরের বিজ্ঞান, ইতিহাস, পরিবেশগত গুরুত্ব এবং তার জীবনচক্রের প্রতিটি বাঁক ধরে এক মনোমুগ্ধকর যাত্রা করব।


প্রথম অধ্যায়: বিজ্ঞানের চোখে ময়ূর

১. শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রকারভেদ

ময়ূর মূলত ফ্যাসিয়ানিডি (Phasianidae) পরিবারভুক্ত, যা কোয়েল (Quail), তিতির (Partridge) এবং মোরগ-মুরগির একই পরিবার। ইংরেজিতে পুরুষ ময়ূরকে বলা হয় পিকক (Peacock), স্ত্রী ময়ূরকে পিহেন (Peahen) এবং এদের বাচ্চাকে পিচিক (Peachick)। সম্মিলিতভাবে এদের পিফাউল (Peafowl) বলা হয়। পৃথিবীতে ময়ূরের তিনটি প্রধান প্রজাতি দেখা যায়:

ক. নীল ময়ূর বা ভারতীয় ময়ূর (Pavo cristatus)

এটিই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত এবং বহুল চর্চিত প্রজাতি। ভারতের জাতীয় পাখি এই প্রজাতিটি।

  • বাসস্থান: মূলত ভারতীয় উপমহাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার শুষ্ক নিম্নভূমির বনভূমি এবং চাষের জমিতে এদের দেখা যায়।
  • শারীরিক বৈশিষ্ট্য: পুরুষ পাখির মাথা, ঘাড় এবং বুক উজ্জ্বল নীল রঙের হয়। এই রংটি আলোর কোণে পরিবর্তিত হতে থাকে। এদের পেখম, যা আসলে অত্যন্ত লম্বা উপরি-পুচ্ছ আবরক পালক (Upper Tail Covert Feathers), তাতে শত শত চোখ-সদৃশ স্পট বা অসেলি (Ocelli) থাকে।

খ. সবুজ ময়ূর বা জাভানিজ ময়ূর (Pavo muticus)

এই প্রজাতিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে, বিশেষ করে জাভা, ইন্দোনেশিয়া এবং মায়ানমারে পাওয়া যায়।

  • শারীরিক বৈশিষ্ট্য: ভারতীয় ময়ূরের চেয়ে আকারে কিছুটা বড় হয়। এদের ঘাড় এবং বুক মেটালিক সবুজ এবং সোনালী রঙের হয়। পুরুষ ও স্ত্রী—উভয় ময়ূরেরই সাজসজ্জা প্রায় একই রকম, যা এদের ভারতীয় ভাই-বোনের থেকে আলাদা করে। তবে এদের অস্তিত্ব বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

গ. কঙ্গো ময়ূর (Afropavo congensis)

এটি একমাত্র আফ্রিকান প্রজাতি, যা কঙ্গোর ঘন জঙ্গলে পাওয়া যায়।

  • শারীরিক বৈশিষ্ট্য: এদের সাজসজ্জা ভারতীয় বা সবুজ ময়ূরের মতো অতটা জমকালো নয়। এটি অপেক্ষাকৃত ছোট, এবং এর পেখমও ততটা দীর্ঘ হয় না। এই প্রজাতি সম্পর্কে জ্ঞান এখনও সীমিত।

২. পেখমের রহস্য: কেন এই জাঁকজমক?

ময়ূরের পেখম প্রকৃতির এক বিস্ময়। বিজ্ঞান আমাদের বলে যে এই পেখম কেবল পালক নয়, এটি জীবনধারণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • যৌন নির্বাচন (Sexual Selection): এই পেখমের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সঙ্গী আকর্ষণ করা। বিবর্তনের ধারায়, যে পুরুষ ময়ূরের পেখম যত বেশি উজ্জ্বল, বড়, এবং তাতে অসেলি-র সংখ্যা যত বেশি, স্ত্রী ময়ূর (Peahen) তাকে তত বেশি সুস্থ ও শক্তিশালী বলে মনে করে। স্ত্রী ময়ূররা দুর্বল বা ছোট পেখমের সঙ্গীকে প্রত্যাখ্যান করে। এটিই হলো যৌন নির্বাচন তত্ত্ব (Sexual Selection Theory)
  • ধ্বংসাত্মক সৌন্দর্য: এই পেখমগুলি খুব লম্বা এবং ভারী হওয়ায় ময়ূরের চলাচলে অসুবিধা হয়, এমনকি উড়তেও সমস্যা হয়। কিন্তু এই ‘অসুবিধা’ বা হ্যান্ডিক্যাপ প্রমাণ করে যে, এত বড় বোঝা বহন করেও ময়ূরটি টিকে থাকতে সক্ষম—সুতরাং, সে জিনগতভাবে শ্রেষ্ঠ।
  • রঙের বিজ্ঞান (Iridescence): ময়ূরের পালকের এই চমকপ্রদ নীল ও সবুজ রং কিন্তু কোনো রঞ্জক পদার্থ (Pigment) থেকে আসে না। এটি হলো কাঠামোগত রঙ (Structural Coloration)। এদের পালকের মাইক্রোস্কোপিক কাঠামো আলোকরশ্মিকে বিশেষ কোণে প্রতিফলিত করে। এই কারণেই পালকের দিকে তাকানোর কোণ পরিবর্তন করলে রংও পরিবর্তিত হয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়: ময়ূরের জীবন ও আচরণ

১. খাদ্য এবং বাসস্থান

ময়ূর সাধারণত সর্বভূক (Omnivore) প্রাণী। তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে:

  • শস্যদানা, বীজ, ঘাস।
  • বিভিন্ন ফল এবং বেরি।
  • পোকা-মাকড়, পিঁপড়ে এবং ছোট সাপও। ময়ূর সাপ শিকার করতে ভালোবাসে এবং সাপের বিষে আক্রান্ত হয় না বলেও বিশ্বাস করা হয়।
  • ছোট ইঁদুর ও টিকটিকি।

এরা মূলত খোলা বনভূমি, নদীর ধারে এবং কৃষিজমির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। উঁচু গাছে রাত কাটায়।

২. প্রেম, নাচ ও ডাক

প্রেমের মরসুমে, পুরুষ ময়ূর পেখম তুলে এক জাদুকরী নৃত্য শুরু করে।

  • পেখম প্রদর্শন (Display): ময়ূর পেখম মেলে অর্ধবৃত্তাকার বা ফ্যান-সদৃশ আকার ধারণ করে, যা প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এরপর সে সেই পেখমকে কাঁপায়, যা এক বিশেষ ধরনের আওয়াজ সৃষ্টি করে—একে বলে শিভারিং বা রাসলিং (Rustling)
  • কেকা ধ্বনি: ময়ূরের তীক্ষ্ণ ডাক বা কেকা ধ্বনি দূর থেকে শোনা যায়। এই ডাক প্রধানত শিকারীর উপস্থিতি জানান দিতে বা সঙ্গীকে আকর্ষণ করতে ব্যবহৃত হয়।
  • বহুবিবাহ (Polygamy): পুরুষ ময়ূর সাধারণত বহু পত্নী গ্রহণ করে। সে যত বেশি স্ত্রী ময়ূরকে আকর্ষণ করতে পারে, ততই তার বংশবৃদ্ধি ঘটে। স্ত্রী ময়ূররা পুরুষদের পেখম পর্যবেক্ষণ করে, এবং সেরা পুরুষটিকে বেছে নেয়।

৩. জীবনচক্র এবং শিকারী

স্ত্রী ময়ূর সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রায় ২৮ দিন সময় লাগে। ছোট বাচ্চাগুলি দ্রুত বাড়তে শুরু করে, তবে পুরুষ ময়ূরের পূর্ণাঙ্গ পেখম আসতে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগে।

ময়ূরের প্রধান শিকারী হলো বাঘ, চিতা, এবং বন্য কুকুর। পেখম থাকার কারণে উড়তে অসুবিধা হলেও, এরা বিপদ দেখলে দ্রুত দৌড়াতে পারে।


তৃতীয় অধ্যায়: সংস্কৃতি, পুরাণ ও ইতিহাসে ময়ূর

ময়ূর শুধু একটি পাখি নয়; এটি ভারতীয় এবং বিশ্বের অন্যান্য বহু সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক (Icon)

১. হিন্দু ধর্মে ময়ূর

হিন্দু ধর্মে ময়ূরকে অত্যন্ত পবিত্র এবং শুভ বলে মনে করা হয়।

  • কার্তিক ও ময়ূর: ময়ূর হলো যুদ্ধ দেবতা কার্তিকের (Lord Kartikeya) বাহন। কার্তিক অসুরদের ধ্বংস করতে ময়ূরকে ব্যবহার করেছিলেন, যা ময়ূরকে আধ্যাত্মিক শক্তি এবং যুদ্ধের বিজয়ের প্রতীক করে তোলে।
  • কৃষ্ণ ও ময়ূর: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবসময় তাঁর মুকুটে ময়ূরের পালক ধারণ করতেন। এটি সৌন্দর্য, প্রেম এবং পবিত্রতার প্রতীক।
  • সরস্বতী: বিদ্যার দেবী সরস্বতীর পাশেও প্রায়শই ময়ূরকে দেখা যায়, যা জ্ঞান ও শিল্পের সৌন্দর্যের প্রতীক।

২. অন্যান্য সংস্কৃতিতে ময়ূর

  • গ্রিক ও রোমান পুরাণ: গ্রিক পুরাণে ময়ূর দেবী হেরা (Hera)-এর সাথে সম্পর্কিত। তার বাহন হিসেবে ময়ূরকে দেখা হয় এবং এর পেখমের ‘চোখগুলি’ অমরত্ব এবং তারার প্রতীক।
  • ইসলামী সংস্কৃতি: কিছু ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে, ময়ূরকে জান্নাতের পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
  • ইতিহাস: ভারতের মুঘল সম্রাট শাহজাহানের বিখ্যাত সিংহাসন, ময়ূর সিংহাসন (Peacock Throne), ময়ূরের নকশায় তৈরি ছিল, যা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য ও রাজকীয়তার চরম প্রতীক।

৩. লোককথা এবং কুসংস্কার

বিভিন্ন লোককথায় বিশ্বাস করা হয় যে ময়ূর তার নাচের মাধ্যমে মেঘকে আকর্ষণ করে এবং বৃষ্টি নিয়ে আসে। ময়ূরের পালক বাড়িতে রাখলে সুখ, শান্তি ও ধন-সম্পদ আসে বলেও অনেকে বিশ্বাস করে। তবে, অন্য একটি বিশ্বাস অনুযায়ী, ময়ূরের পালক দুর্ভাগ্যও নিয়ে আসতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়।


চতুর্থ অধ্যায়: পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং সংরক্ষণ

ময়ূর, বিশেষ করে ভারতীয় ময়ূর, এখনও IUCN-এর বিপজ্জনক নয় (Least Concern) তালিকায় থাকলেও, অন্য প্রজাতিগুলি গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।

১. আবাসস্থলের ক্ষতি

ব্যাপক বন উজাড় এবং কৃষিকাজের জন্য ভূমির পরিবর্তনের কারণে ময়ূরের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে। সবুজ ময়ূর (Green Peafowl) বিপন্ন (Endangered) প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত, যার প্রধান কারণ তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্রমাগত ধ্বংস।

২. অবৈধ শিকার এবং পাচার

তাদের সুন্দর পালকের জন্য ময়ূর অবৈধভাবে শিকার হয়। পালক সংগ্রহ এবং মাংসের জন্য চোরাচালানও তাদের সংখ্যা কমার একটি কারণ। যদিও ভারতে ময়ূর শিকার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

৩. মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত

শস্য খেতে আসায় অনেক সময় কৃষকরা ময়ূরকে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলে। শহরাঞ্চলে ময়ূরের আনাগোনা বাড়ার কারণে তাদের সাথে মানুষের সংঘাতও বাড়ছে।

সংরক্ষণ প্রচেষ্টা

ময়ূর সংরক্ষণের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলি কাজ করছে। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং জাতীয় উদ্যানগুলিতে এদের বাসস্থান সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ শিকার বন্ধ করা এই সুন্দর পাখিকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।


উপসংহার: সৌন্দর্যের শেষ কথা

ময়ূর প্রকৃতি সৃষ্ট এক অসামান্য শিল্পকর্ম (Masterpiece)। তার পেখমের রঙে মিশে আছে কোটি বছরের বিবর্তন, আর তার ইতিহাস জড়িয়ে আছে আমাদের সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে। ময়ূর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সৌন্দর্য এবং বন্যতা—উভয়ই প্রকৃতির দান এবং আমাদের অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক।

ময়ূরের রাজকীয়তা কেবল তার পালকেই নয়, তার অবাধ, বন্য জীবনযাপনে। আমাদের দায়িত্ব এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে রক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল ছবি বা গল্পে নয়, বরং তাদের চোখে এই অপূর্ব নৃত্য দেখতে পায়। ময়ূর আমাদের শেখায়—নিজেদের দুর্বলতা সত্ত্বেও কীভাবে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সুন্দর রূপে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। আর এই শিক্ষাই হয়তো মানব সভ্যতার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি।

Leave a Reply