আমি যখন দ্বিতীয়বারের মতো সিঁথিতে সিঁদুর নিলাম, তখন আমার বাম হাতের মুষ্টিতে ভাঁজ করে রাখা ছিল চারটি শর্ত—কাঠিন্যের, কিন্তু লজ্জাহীন সত্যের। এই শর্তগুলোই আমার নতুন জীবনের তালা-চাবি।
১) আমি কোনো সন্তান নেব না—ডাক্তারি রিপোর্টে আমার নামের পাশে অনেকদিন ধরেই লেখা ‘সেকেন্ডারি ইনফার্টিলিটি’।
২) নতুন ঘরে দুইটা ছোট মানুষ থাকবে—তানভীরের ছেলে-মেয়ের জন্য আমাকে নিঃশর্ত হৃদয় খুলে রাখতে হবে।
৩) এই বিয়ে ভালোবাসার সিনেমা নয়—দুটি ভাঙা মানুষের পরিস্কার বোঝাপড়া।
৪) আবেগ দিয়ে চাপ তৈরি করবো না, তানভীরও করবে না—আমরা দু’জন দু’জনের নিরাপদ তীর।
বিয়ের রাতেই তানভীর বলেছিল, “আমরা নাটক করবো না, রুনা। আমি তোমার কাছে সত্যি চাই, তুমি আমার কাছে শ্বাস নেওয়ার মতো শান্তি।”
আমি মাথা নেড়ে হেসেছিলাম। নাটক অনেক হয়েছে জীবনে। এবার নিরাময় চাই।
আমার নাম রুনা আরা। প্রথম সংসার ছিল ভালোবাসার—ছ’বছর প্রেম, আট বছর বিয়ে। শূন্য কোলে আমি, ধৈর্যহীন সময়, তুমুল পরিবার—শেষমেষ বিচ্ছেদ। যে ছেলেটা একসময় বলত, “তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না,” সেও বেঁচে উঠল আমার অনুপস্থিতিতে। নতুন বউ, নতুন বাচ্চা—তার পৃথিবী নতুন করে জন্ম নিল। আমি তখন এক টুকরো নীরবতা।
নীরবতাই ছিল একদিন আমার সবচেয়ে বড় দক্ষতা। আমি কাজে ঢুকে গেছিলাম, স্কুল-শিক্ষিকা হিসেবে; দুপুরবেলা শিশুরা “আপা, আপনি হাসলে আমাদের ভালো লাগে” বললে মনটা একটু একটু করে জোড়া লেগে যেত। তবু রাতগুলোতে বিছানায় শুয়ে মনে হতো—আমি কি ভুল পথে হাঁটলাম? ভালোবাসা কি সত্যিই এমন ভঙ্গুর?
তখনই আসে তানভীর। বয়সে সাত বছর বড়। স্ত্রী ক্যান্সারে হারিয়েছেন, উনি দুই বছর ছেলেমেয়েকে নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করেছেন। প্রথম দিন দেখা করতে গিয়ে সে বলল, “আমি দুঃখ বেচতে আসিনি। আমি চাই, আমার দুইটা বাচ্চার জন্য একজন মানুষের কোল থাকুক। আর আমার জন্য—একটা আলাপের টেবিল।”
কথাটা পারফরম্যান্স ছিল না, ছিল পরিপক্ব ক্লান্তি। আমি তাতে আশ্রয় দেখলাম। বললাম, “আমারও একটা আলাপ-টেবিল দরকার। তবে শর্ত—আমি স্বাধীনতা ভালোবাসি। আমার মা আছেন, আমাকে সপ্তাহে দুইদিন তার কাছে যেতে হবে।”
তানভীর বলল, “তোমার মা আমাদেরও মা। যাওয়া-আসার দরকার হলে আমাকে বলবে।”
বিয়ে হলো খুবই সহজ করে—ছাদের টিনে বৃষ্টির শব্দ, চায়ের কাপ, বাসায় ক’জন আপনজন। কাজীর খাতায় সই করে আমি নতুন ঘরে ঢুকলাম। তানভীরের মেয়ে নূহা (ন’ বছর) দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপা, আপনি কি আমাদের ম্যাথ শেখাবেন?” আমি হেসে বললাম, “শুধু ম্যাথ না—ভালোবাসাও।” নূহা বুঝল কিনা জানি না; কিন্তু সে হাতটা বাড়িয়ে ধরল। ছোট ছেলে রিদওয়ান (ছয় বছর) চুপচাপ আমার ওড়নার কোণা টেনে বলল, “আপু, কারি খাবেন?”
আমি বুঝলাম—শিশুরা ডিকশনারি ছাড়াই সম্পর্ক বানাতে শেখে।
তানভীর ব্যস্ত মানুষ, সফটওয়্যার কোম্পানি চালায়। তবু সকালে টিফিনবক্সে বিস্কুট আর আপেল সাজিয়ে রাখে, নূহার চুলে পনিটেল বেঁধে দেয়। আমি তাদের স্কুলবাস পর্যন্ত দিয়ে আসি, বাড়ি ফিরেই আলমারিতে রাখি বৌ সাজার গয়না—ইচ্ছেকৃত, কারণ আমার বউ হওয়া মানে গয়না না, দায়িত্ব।
রাতে আমরা দুইজন অনেক কথা বলি—কিন্তু প্রেমের ভাষায় নয়। আমি তানভীরকে জিজ্ঞেস করি, “আজ অফিসে কত লাইন কোড লিখেছ?” সে হাসে, “গুনে রাখো নি, কিন্তু মাথা হালকা।”
আমি তাকে বলি, “আজ নূহা ভগ্নাংশ করেছে, রিদওয়ান ‘স’ আর ‘শ’ মিলিয়ে ফেলছে। তোমার ভয় কী?”
সে বলে, “ভয়—তোমাকে এই যুদ্ধের মধ্যে টেনে এনেছি। তুমি কি ক্লান্ত হও না?”
আমি বলি, “ক্লান্তি মানেই থামা নয়।”
একদিন তানভীরের বোনেরা এসে বসলো। তারা ভালো, কিন্তু শোকশতক পুরোনো সম্পর্কের মতোই খুঁতখুঁতুনি আছে। একজন ফিসফিস করে বলল, “রুনা কি সত্যিই… মানে… সন্তান নেবে না?” অন্যজন বলল, “আচ্ছা, আশপাশে শোনা যায়—ডিভোর্সিরা নাকি ‘নিজের মতো’ থাকে…”
আমি শুনে চা বানাতে থাকলাম। তানভীর জোরে বলল, “রুনা আমাদের ঘরের সম্মান। এখানে ফিসফিসানি চলবে না। প্রশ্ন থাকলে সামনে করো।”
আমি তাকালাম তার দিকে—একটা ‘আমার মানুষ’কে দেখলাম। ভালবাসা তখনও বলিনি; কিন্তু নিরাপত্তা কি প্রেম নয়?
শিশুরা ধীরে ধীরে আমাকে নিজেদের ‘অভ্যাস’ বানিয়ে ফেলল। নূহার সঙ্গে রাত জেগে বিজ্ঞান প্রজেক্ট করি—বাল্ব জ্বলে উঠলে সে চিৎকার দেয়, “আপা, ম্যাজিক!” রিদওয়ান টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে বলে, “আপার পা খুঁজ!” আমি মেঝেতে বসে তাকে হাতে তুলে নিই। তানভীর দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে—তার চোখে আমি দেখি অন্যরকম স্বস্তি; যেন আমরা তিনজন একসাথে তার কষ্টকে চ্যালেঞ্জ করছি।
এই শান্ত সময়ে হঠাৎ একদিন পৃথিবী বদলে গেল। আমি অসুস্থ হচ্ছিলাম, ক্লান্তি ছাড়ছিল না। স্কুলের ম্যাডাম বললেন, “রুনা, ডাক্তার দেখাও।” রুটিন চেকআপে গিয়ে ডাক্তার মৃদু হাসি হেসে বলল, “কনগ্র্যাচুলেশন!”
আমি প্রথমে বুঝিনি। তারপর বুঝে শরীরটা কেঁপে উঠল—আমি সন্তানসম্ভবা।
ঘরের আলো তখনও জ্বলছে, অথচ আমি অন্ধকার দেখছি। এক হাতে রিপোর্ট, অন্য হাতে মোবাইল। তানভীরের নাম্বার টিপতে টিপতে থেমে গেলাম। এই সংবাদ কি তার ওপর বোঝা? নূহা-রিদওয়ানের পৃথিবী কি কেঁপে উঠবে?
বাড়ি ফিরতেই রান্নাঘরে চাপা গুঞ্জন। বোনেরা কেউ কেউ কানের পাশে কথা বলছে, “এটা কি ঠিক হলো?”
আমি দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকলাম। বুকের ভিতর ক’টা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ছে। আমি জানালার বাইরে বৃষ্টির রেখা গুনছি—ক্লাস এইটের কোন ছাত্রকে বলেছিলাম, গুণতে নেই?
তানভীর এলো। আমি মাথা তুলতে না তুলতেই সে রিপোর্টটা হাতে নিল। মুখে কী ভাব, বোঝা গেল না। অস্বস্তিকর নীরবতা ফেটে সে বলল, “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
আমি বললাম, “আমি ভয় পাইনি। কিন্তু কাউকে দিয়ে আমার সন্তানের মর্যাদা কমাতে দেব না।”
তানভীর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “কে মর্যাদা কমাবে? আমি? এই ঘর?”
তার গলা শক্ত হয়ে উঠল, সে ড্রইংরুমে গিয়ে বলল, “সবাই শোনো—এই খবর ঈদের চেয়েও বড়। কেউ যদি আমার স্ত্রীকে, আমার শিশুকে নিয়ে একটুও কথা বলে, তাদের জন্য এই ঘরের দরজা বন্ধ।”
ঘরটা নিস্তব্ধ। আমি ভেতরে ভেতরে কাঁপছি। তানভীর ফিরলে আমি চোখে পানি নিয়ে বললাম, “তুমি না চেয়েও আমাকে এত বড় দায় দিয়ে দিলাম…”
সে থামিয়ে দিল, “দায় না, দান। তবে একটা সত্যি বলি? আমি সুখী হলেও ভয় পাচ্ছি। তিনটা বাচ্চা, এক বাড়ি, এক অফিস, এক পৃথিবী—আমি একা পারব তো?”
আমি প্রথমবারের মতো তার হাত ধরলাম, “ভাগ করে নিবো। তুমি যদি পারো, আমি পারি।”
এবার আমাকে হাসপাতালে যেতে হয় বেশি। সকালে নূহা আমার শাড়ির আঁচল ঠিক করে বলে, “আপা, আমি কি ছোট্ট ন্যানি হতে পারি?” রিদওয়ান মুখ ভার করে বলে, “আমি কি ভাই হবো? খারাপ না!”
তানভীর ধীরে ধীরে তার ব্যস্ততা সমন্বয় করছে। রাতে আমার পায়ের দিকে উষ্ণ মালিশ করে বলে, “আজ অফিসে সবাইকে বলেছি—আমি আটটার পর ফোন তুলবো না।”
আমি হাসি, “তোমার কোম্পানি চলবে?”
সে বলে, “মানুষ আগে, তারপর কোম্পানি।”
এইসব ছোট ছোট সংলাপেই ভালোবাসা জন্মায়—আমি তখনই বোঝলাম। “ভালোবাসি” না বলেও মানুষ কেমন ভালোবাসে।
এক রাতে আমি বললাম, “তুমি কি কখনো ‘হানিমুন’ করতে চেয়েছিলে?”
সে হাসল, “আরো আগে জিজ্ঞেস করলে বলতাম—লাভ ইজ ওভাররেটেড। এখন বলি—যাব। তবে যেখানে তুমি হাঁটতে পারবে ধীরে।”
আমি বললাম, “রাতারগুল গেলে কেমন হয়? নৌকায় করে ধীরে জল, ধীরে বাতাস।”
সে বলল, “চলো।”
যাবার আগের রাতে বোনেরা চুপচাপ এসে বসলো। একজন বলল, “ভাবি, আমরা আগের দিনের জন্য দুঃখিত। আপনি আসার পর থেকে নূহা-রিদওয়ানকে হাসতে দেখেছি আবার। আপনি থাকলে ঘরটা ঘর হয়। আমরা ভুল বুঝেছিলাম।”
আমি হালকা হেসে বললাম, “ঘর বানানো সহজ না। সবাই মিলেই তো বানায়।”
আমার বাচ্চা যখন আস্তে আস্তে বাড়ছে, ততই বাড়ছে আমার দৃঢ়তা। আমি তানভীরকে বলি, “ভবিষ্যতে তোমার মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে—আমরা তাদের স্বপ্নে কৃপণতা করবো না।”
তানভীর বলে, “তোমাকে কি আমি আর স্কুলে পাঠাতে পারি? মাস্টার্স শেষ করোনি—শেষ করো।”
আমি থমকে যাই—কেউ আমার জন্য এমন প্ল্যান করে কবে?
আমি ভাবি, একজন মানুষ যখন তোমাকে ভবিষ্যতে ঠেলে দেয়, সে কি প্রেম করে না?
এক বিকেলে নূহা-রিদওয়ান বাসার ভেতর হাতে লেখা কার্ড নিয়ে ঢুকল—“ওয়েলকাম বেবি সিব্লিং।” রঙিন কাগজ, টালমাটাল হরফ। তানভীর দরজায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ, মুখে একরকম নিরব আনন্দ। আমি কার্ডটা বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি।
কাঁদতে কাঁদতে বলি, “তুমি কি আমাকে কখনো বলবে—ভালোবাসি?”
সে হেসে বলল, “আজকে দরকার আছে?”
আমি বললাম, “নেই। কেবল জিজ্ঞেস করলাম।”
সন্তান জন্মের আগের রাত। তীব্র বৃষ্টি। বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে লুকোচুরি খেলছে। হাসপাতালে যাওয়ার আগে তানভীর আমার জুতোর ফিতা বাঁধছিল। আমি মাথার ওপর হাত রেখে বললাম, “যদি কখনো আমি থেমে যাই—তুমি থামবে না। তিনজনকে নিয়ে দৌড়াবে।”
সে বলল, “তুমি থাকলে দৌড়াই, তুমি না থাকলেও দৌড়াবো—কিন্তু তুমি থাকলে আমার কাছে দৌড়ানোটা অর্থ পায়।”
ডেলিভারি রুমের সাদা আলো, কাঁচের গন্ধ, নার্সের তাড়া। মাঝামাঝি সময়ে আমি ভাবলাম—আমি কি সত্যিই ‘বন্ধ্যা’ ছিলাম? নাকি সমাজ আমার ওপর একটা সিল মেরে রেখেছিল—আমি নিজেও বিশ্বাস করেছিলাম?
বাচ্চা যখন প্রথম কান্না করল, আমার ভেতরের কণ্ঠ বলল—জীবন দ্বিতীয়বারও জন্ম নেয়।
বাড়িতে ফিরে দেখি, দরজায় রঙিন কাগজে লেখা—“স্বাগতম, ছোট আকাশ।” নামটা রিদওয়ান রেখেছে। নূহা বলল, “আপা, এখন থেকে আমরা চারজন। আব্বু পাঁচ।”
আমি হাসলাম, তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললাম, “এইবার বলবে?”
সে বলল, “কী?”
আমি বললাম, “যেটা দরকার নেই—তবু শোনা ভালো লাগে।”
সে মাথা নিচু করে ছোট হয়ে আমার কানের কাছে বলল, “ভালোবাসি।”
আমি জানি, পৃথিবীর সব গল্প গোলাপি নয়। তবু মানুষের হাত যখন আরেকটা হাত আঁকড়ে ধরে, তখন কঠিন শর্তগুলো একসময় নরম হয়ে যায়। দ্বিতীয় দরজায় দাঁড়িয়ে বুঝেছি—প্রয়োজনের নিরাপত্তা থেকেই একদিন জন্মায় উচ্চারণহীন প্রেম।
আর প্রেম, সে কখনো কেবল চার অক্ষরের শব্দ নয়—সে ভিজে তোয়ালে ধুয়ে দেওয়া, রাত জেগে জ্বর মাপা, স্কুলের ব্যাগ গোছানো, রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে বলার সাহস—“এটা আমাদের।”