বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ জাপান। প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা, দীর্ঘায়ু মানুষের দেশ হিসেবে পরিচিত এই রাষ্ট্রটি আজ এক ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকটের মুখোমুখি।
আর সেই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকটি হলো—পুরো জাপানজুড়ে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি বাড়ি আজ ফাঁকা পড়ে আছে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। একটি আধুনিক, উচ্চ-আয়ের, নিরাপদ দেশের লাখ লাখ বাড়ি আজ পরিত্যক্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত কিংবা মালিকবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
আজ আমরা এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি—
কেন জাপানে এত বাড়ি ফাঁকা?
কীভাবে বাড়ছে ‘অ্যাকিয়া’ সংকট?
এই ফাঁকা বাড়িগুলো কার?
জাপানের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী?
আর বিদেশিদের জন্যও কি বাড়ি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে?
চলুন বিস্তারিত জানি—
জাপানে ‘অ্যাকিয়া’ সংকট—যে শব্দটি এখন জাতীয় সমস্যা
‘Akiya’ (空き家) শব্দের অর্থ—ফাঁকা বাড়ি।
জাপানে এই মুহূর্তে সরকারি হিসেব অনুযায়ী ৮.৯ মিলিয়ন, আর বেসরকারি গবেষকদের দাবি ১০ মিলিয়নেরও বেশি বাড়ি খালি পড়ে আছে।
এর মানে—
জাপানের প্রতি ৭টি বাড়ির মধ্যে ১টি বাড়ি ফাঁকা!
এই সংখ্যাটি শুধু ভয়ঙ্কর নয়, দেশের জনসংখ্যার দ্রুত হ্রাস ও বয়স্ক সমাজের বর্তমান চিত্রটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
কেন জাপানে এত বাড়ি খালি হয়ে যাচ্ছে?
1️⃣ জন্মহার কমে যাওয়া
জাপানের জনসংখ্যা দ্রুত কমছে।
জন্মহার বিশ্বের অন্যতম নিম্ন—
প্রতি দম্পতিতে গড়ে ১.৪ সন্তান।
ফলে নুতন পরিবার কম তৈরি হচ্ছে, আর পুরনো বাড়িগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে।
2️⃣ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মৃত্যু ও উত্তরাধিকারীদের অনীহা
জাপানের বয়স্ক মানুষের হার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি।
অনেকে মৃত্যুবরণ করেন, আর তাদের সন্তানরা শহরে থাকতে চায়।
গ্রামের পুরোনো বাড়িগুলো তারা রক্ষণাবেক্ষণ করতে চায় না। ফলে বাড়ি থাকে ফাঁকা।
3️⃣ গ্রামাঞ্চল থেকে যুবকদের শহরমুখী হওয়া
টোকিও, ওসাকা, নাগোয়া—এসব শহরে কাজের সুযোগ বেশি।
তাই গ্রামীণ বাড়িগুলো জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে।
যেখানে একসময় হাজারো মানুষের বসতি ছিল, এখন সেখানে ভৌতিক নীরবতা।
4️⃣ পুরনো বাড়ি পছন্দ না করার সংস্কৃতি
জাপানিরা ‘নতুন বাড়ি’ পছন্দ করে।
২০–২৫ বছরের পুরনো বাড়ি তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
ফলে এগুলো বিক্রির বদলে পরিত্যক্তই পড়ে থাকে।
5️⃣ বাড়ি ভাঙা ব্যয়বহুল
একটি পুরনো বাড়ি ধ্বংস করতে ব্যয় হয় ৮,০০০ থেকে ২০,০০০ মার্কিন ডলার।
অনেক পরিবার এই ব্যয় বহন করতে চায় না।
ফলে তারা বাড়ি ফেলে রাখে।
ফাঁকা বাড়ির কারণে জাপানের সামনে কী সংকট তৈরি হচ্ছে?
✔ শহরের বাইরে ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ তৈরি হচ্ছে
কিছু গ্রামে ৭০–৮০% বাড়ি খালি।
দিনের বেলায়ও রাস্তা নিস্তব্ধ।
✔ অপরাধ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বৃদ্ধি
পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে—
- আগুন লাগে
- অপরাধীরা লুকিয়ে থাকে
- প্রাণী-জন্তুর আবাস হয়ে যায়
✔ অর্থনীতিতে বড় নেতিবাচক প্রভাব
কম বাসিন্দা মানে কম কর, কম কেনাকাটা, কম ব্যবসা।
বহু শহর জনশূন্য হয়ে যাওয়ার পথে।
জাপান সরকারের পদক্ষেপ
জাপান সরকার এখন চরম উদ্বেগে।
তারা “Akiya Bank” নামে বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে।
যেখানে—
- মাত্র ১০০০ ডলার থেকে ১০,০০০ ডলার মূল্যে বাড়ি বিক্রি করা হচ্ছে
- কিছু বাড়ি ফ্রি দেওয়া হচ্ছে
- সংস্কার করলে নগদ অনুদানও দিচ্ছে সরকার
এসব বাড়ি কিনে—
- স্থানীয় মানুষ
- বিদেশি নাগরিক
- উদ্যোক্তা
- কৃষক
অনেকেই নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিদেশিরা কি জাপানে বাড়ি কিনতে পারে?
✔ হ্যাঁ, জাপান পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে বিদেশিরা ১০০% সম্পত্তির মালিক হতে পারে।
✔ ভিসা বা নাগরিকত্ব লাগেনা সম্পত্তি কিনতে।
✔ আপনি পর্যটন ভিসায় জাপানে গিয়ে বাড়ি কিনতে পারেন।
তবে—
- বাড়ি কেনা মানেই জাপানে থাকবার অধিকার নয়।
- থাকার জন্য ভিসা বা ওয়ার্ক-পারমিট লাগবে।
জাপানের তরুণ প্রজন্ম কেন বাড়ি নেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে?
1️⃣ চাকরির অনিশ্চয়তা
অনেকেই কম বেতনে চাকরি করেন, ফলে বাড়ি কিনতে ঝুঁকি নিতে চান না।
2️⃣ উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়
জাপানে বাড়ি মেরামতের খরচ অনেক বেশি।
3️⃣ জীবনযাত্রার ভিন্নতা
তরুণরা বেশি স্বাধীনতাপ্রেমী, মালিকানার চেয়ে ভাড়া বাসার দিকেই ঝুঁকছেন।
ভবিষ্যতে জাপানের কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
১️⃣ ২০৫০ সালের মধ্যে জাপানের ৩ কোটি বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকতে পারে।
এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘হাউজিং ক্রাইসিস’।
২️⃣ বহু গ্রাম পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।
৩️⃣ সরকার হয়তো ভবিষ্যতে আরও কম দামে বা সম্পূর্ণ ফ্রি বাড়ি দিতে বাধ্য হবে।
বিদেশিদের জন্য সুযোগ—যারা চান জাপানে স্থায়ীভাবে থাকতে
আপনি যদি—
- কাজ করতে চান
- ব্যবসা করতে চান
- বা জাপানে শান্ত জীবন কাটাতে চান
তাহলে এখনই সেরা সময়।
কারণ বাড়ি সস্তা, জমি সস্তা, আর সরকার নতুন বাসিন্দা চাইছে।
শেষকথা: উন্নত দেশ জাপান—তবুও জনশূন্যতা এক কঠিন সংকেত
জাপান পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি।
কিন্তু জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং দ্রুত বৃদ্ধ বয়সী সমাজের কারণে তাদের সামনে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন ভবিষ্যৎ।
৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ফাঁকা বাড়ি শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি একটি জাতির জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি।
এই সংকট মোকাবেলায় সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও, ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।