২০২৬ সাল বিশ্ব ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব অর্থনীতি এবং অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া আমূল পরিবর্তন, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের নতুন চাহিদা এবং উন্নত দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশীদের জন্য বিদেশ যাত্রার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—উভয়ই নতুন মোড় নিয়েছে।
নিচে ২০২৬ সালে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিসার সাফল্যের হার (Visa Success Ratio), সুযোগ এবং অন্তরায়গুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
১. উত্তর আমেরিকা: স্বপ্নের গন্তব্য এবং পরিবর্তিত বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্র (USA):
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজিত হতে যাচ্ছে। এই মেগা ইভেন্টকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও ব্যবসা সংক্রান্ত বি১/বি২ (B1/B2) ভিসার চাহিদা আকাশচুম্বী।
- ভিসা রেশিও (পর্যটন ও ব্যবসা): বিশ্বকাপের কারণে ইন্টারভিউ স্লট পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে, তবে যারা আগে থেকে আবেদন করবেন এবং সুসংগঠিত কাগজপত্র জমা দেবেন, তাদের জন্য সাফল্যের হার ৪৫% থেকে ৫৫% এর মধ্যে থাকবে।
- স্টুডেন্ট ভিসা (F1): উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রতি ইতিবাচক থাকবে। বিশেষ করে স্টেম (STEM) সাবজেক্টের শিক্ষার্থীদের জন্য সাফল্যের হার ৬৫% ছাড়িয়ে যেতে পারে।
- ইমিগ্র্যান্ট ভিসা: ২০২৬ সালে ফ্যামিলি স্পনসরশিপ ও ডাইভারসিটি ভিসার ক্ষেত্রে ব্যাকলগ কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
কানাডা (Canada):
কানাডা সরকারের ‘ইমিগ্রেশন লেভেল প্ল্যান ২০২৪-২০২৬’-এর চূড়ান্ত বছর এটি। দেশটির লক্ষ্য প্রায় ৫ লক্ষ নতুন অভিবাসী গ্রহণ করা।
- ভিসা রেশিও (স্টাডি পারমিট): সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্টুডেন্ট ভিসার নিয়ম কঠোর করলেও, ২০২৬ সালে বাংলাদেশী জেনুইন স্টুডেন্টদের জন্য ভিসা রেশিও ৫০% এর আশেপাশে থাকবে।
- এক্সপ্রেস এন্ট্রি ও পিএনপি: দক্ষ পেশাজীবী (আইটি, হেলথকেয়ার, কনস্ট্রাকশন) যারা আইইএলটিএস-এ ভালো স্কোর করবেন, তাদের জন্য সাফল্যের হার অনেক বেশি থাকবে।
২. ইউরোপ: নতুন দিগন্তের হাতছানি
ইউরোপের দেশগুলো বর্তমানে মারাত্মক শ্রমিক সংকটে ভুগছে। ২০২৬ সালে দক্ষিণ এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।
যুক্তরাজ্য (UK):
২০২৫ সালের শেষার্ধে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে কিছু কঠোরতা আনা হলেও ২০২৬ সালে তা স্থিতিশীল হবে।
- স্টুডেন্ট ভিসা: ডিপেন্ডেন্ট বা নির্ভরশীলদের নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় আবেদন কমতে পারে, তবে মূল আবেদনকারীর ভিসা রেশিও ৭০% এর ওপরে থাকবে।
- কেয়ার গিভার ও স্কিলড ওয়ার্কার: স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ বাংলাদেশীদের জন্য ভিসার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
জার্মানি ও সেনজেন এলাকা:
- জার্মানি: জার্মানির ‘অপরচুনিটি কার্ড’ (Chancenkarte) ২০২৬ সালে বাংলাদেশীদের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হবে। পয়েন্ট ভিত্তিক এই পদ্ধতিতে দক্ষ তরুণদের জন্য ভিসা রেশিও ৮০% পর্যন্ত হতে পারে।
- ইতালি, রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া: এই দেশগুলোতে কৃষি ও নির্মাণ খাতে ব্যাপক কর্মী চাহিদা থাকবে। তবে দালালের খপ্পরে পরে ভুল তথ্য দিলে ভিসা রিজেকশন রেট বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে টুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের জন্য রেশিও থাকবে ২৫% – ৩৫%।
৩. মধ্যপ্রাচ্য: পেশাদারিত্বের নতুন দাবি
২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুধু কায়িক শ্রমিকের বদলে দক্ষ জনবল (Skilled Labor) এর দিকে বেশি ঝুঁকবে।
- সৌদি আরব: ভিশন ২০৩০-এর কাজ দ্রুত গতিতে চলায় মেগা প্রজেক্টগুলোতে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান এবং সার্ভিস সেক্টর কর্মীদের চাহিদা থাকবে। ভিসা রেশিও ৮৫% এর বেশি থাকবে।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): গোল্ডেন ভিসা এবং গ্রিন ভিসার মাধ্যমে ইনভেস্টর ও দক্ষ কর্মীদের স্বাগত জানানো হবে। সাধারণ শ্রমিকদের জন্য ভিসা রেশিও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে (৭০% – ৮০%)।
- কাতার ও কুয়েত: নির্মাণ খাতের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা খাতে ভিসা প্রাপ্তি সহজ হবে।
৪. এশিয়া-প্যাসিফিক: নতুন বাজার
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া:
২০২৬ সালে এই দুটি দেশ বাংলাদেশী তরুণদের জন্য “গোল্ডেন অপরচুনিটি” নিয়ে আসবে।
- জাপান (SSW ও টেকনিক্যাল ইন্টার্ন): ভাষা শেখার শর্ত পূরণ করলে জাপানের ভিসা রেশিও ৯০% এর বেশি।
- দক্ষিণ কোরিয়া (EPS): লটারি এবং ভাষা পরীক্ষার মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের ভিসা রিজেকশন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
মালয়েশিয়া:
২০২৫ সালের সংস্কারের পর ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও স্বচ্ছ হবে। জিরো কস্ট মাইগ্রেশন বা কম খরচে কর্মী নিয়োগের ফলে সাধারণ কর্মীদের ভিসা রেশিও ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে।
৫. ভিসা রেশিওকে প্রভাবিত করবে যে ফ্যাক্টরগুলো
২০২৬ সালে ভিসা পাওয়া না পাওয়া মূলত নিচের চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে:
১. ডিজিটাল প্রোফাইল ও সঠিক ডকুমেন্টস: ফেক বা ভুয়া কাগজপত্র শনাক্ত করার জন্য উন্নত দেশগুলো এখন এআই (AI) ব্যবহার করছে। স্বচ্ছ ফাইলধারীদের সাফল্যের হার অনেক বেশি থাকবে।
২. ভাষাগত দক্ষতা: আইইএলটিএস (IELTS), পিটিই (PTE) বা সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষার দক্ষতা থাকলে ভিসা রেশিও সরাসরি ৩০% বৃদ্ধি পাবে।
৩. আর্থিক সক্ষমতা: টাকার মানের অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে স্পনসরশিপ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।
৪. রাজনৈতিক ইমেজ: ২০২৫ সালের সংস্কারের পর বাংলাদেশের পাসপোর্ট ইনডেক্সে ইতিবাচক পরিবর্তন এলে অন-অ্যারাইভাল এবং ই-ভিসার সুযোগ বাড়বে।
৬. ২০২৬ সালে সম্ভাব্য ভিসা রেশিও সারণী
| দেশ/অঞ্চল | স্টুডেন্ট ভিসা | দক্ষ কর্মী ভিসা | টুরিস্ট ভিসা |
| যুক্তরাষ্ট্র | ৬০% – ৬৫% | ৫০% | ৪০% – ৫০% |
| কানাডা | ৫০% – ৫৫% | ৬০% – ৭০% | ৩০% – ৪০% |
| যুক্তরাজ্য | ৭০% – ৭৫% | ৬৫% | ৪৫% |
| জার্মানি | ৮০% | ৮৫% | ৩৫% |
| জাপান/কোরিয়া | ৭০% | ৯০% | ৩০% |
| সৌদি আরব | – | ৯০% | ৮০% |
৭. উপসংহার: আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ টিপস
২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা রেশিও সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক থাকবে। তবে ঢালাওভাবে আবেদন না করে নিজের প্রোফাইলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশে আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- দক্ষতা বৃদ্ধি: আপনি যদি শ্রমিক হিসেবেও যেতে চান, তবুও কোনো একটি কারিগরি কাজে প্রশিক্ষণ নিন।
- এজেন্ট নির্ভরতা কমান: উন্নত দেশগুলোর জন্য সরাসরি এমবেসি বা ভ্যাপস (VFS) এর মাধ্যমে আবেদন করার চেষ্টা করুন।
- ডিজিটাল ট্রেইল: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার কার্যক্রম এবং আপনার অতীতের ট্রাভেল হিস্ট্রি সঠিকভাবে বজায় রাখুন।
চূড়ান্ত কথা: ২০২৬ সালে যারা আইটি, নার্সিং, কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রিনিউয়েবল এনার্জি খাতে দক্ষ, তাদের জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশের ভিসার দরজা খোলা থাকবে। জেনুইন আবেদনকারীদের জন্য ২০২৬ হতে পারে বিদেশ যাওয়ার শ্রেষ্ঠ বছর।
বি.দ্র. এই প্রতিবেদনটি বর্তমান বৈশ্বিক অভিবাসন প্রবণতা এবং ২০২৬ সালের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ভিসা রেশিও সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।