বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ আর্থিক সংকটে দাঁড়িয়ে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ (National Debt) দাঁড়িয়েছে ৩৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন (GDP)-এর প্রায় ১২৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিশাল ঋণের ভার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নয়, গোটা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোকেই প্রভাবিত করছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি আর্থিক বাজার এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে — বিশ্বের এই বৃহত্তম অর্থনীতির পতন হলে সেটি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী ধরনের ধাক্কা আনতে পারে।
💰 ঋণের পেছনের বাস্তব চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, অক্টোবর ২০২৫ নাগাদ দেশটির মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৮.০৪ ট্রিলিয়ন ডলার। মাত্র এক বছরের মধ্যে ঋণ বেড়েছে প্রায় ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালের মহামারী-পরবর্তী সময়ের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঋণ বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং রাজনৈতিক অচলাবস্থার সরাসরি ফল।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাজেট দ্বন্দ্ব, সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), স্বাস্থ্যসেবা (Medicare) এবং অতিরিক্ত ঋণসেবার (Interest Payment) বোঝা — সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক আর্থিক দোলাচলে।
📊 যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কাঠামো: কীভাবে গঠিত?
যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দুই ভাগে বিভক্ত:
- Public Debt (জনঋণ) — প্রায় ৩০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ব্যক্তি, ব্যাংক, কর্পোরেশন, বিদেশি সরকার ও সংস্থার কাছে ধার।
- Intragovernmental Holdings — প্রায় ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলোর মধ্যে লেনদেনজনিত দায়।
তুলনা করলে দেখা যায়, এই ঋণ বৃদ্ধি এত দ্রুত হয়েছে যে, প্রতি আমেরিকান নাগরিকের উপর গড়ে এখন $114,000 ডলার ঋণ পড়েছে। অর্থাৎ, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বার্ষিক আয়ও আজ সরকারের দায়ের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
⚠️ কেন ঋণ বাড়ছে এত দ্রুত?
১️⃣ অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়:
মহামারির পর অর্থনীতিকে সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে অর্থ মুদ্রণ ও ব্যয় করেছে। এখন সেই অতিরিক্ত অর্থনীতিক প্রণোদনার প্রভাবেই ফেডারেল ঘাটতি (Deficit) বেড়েছে।
২️⃣ উচ্চ সুদের হার:
ফেডারেল রিজার্ভ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়েছে। কিন্তু এর ফলে সরকারের ঋণসেবা খরচও বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বছরে প্রায় $১ ট্রিলিয়ন ডলার শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় করছে।
৩️⃣ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও “Debt Ceiling Crisis”:
প্রতি বছর “ডেব্ট সিলিং” বা ঋণসীমা বৃদ্ধি নিয়ে কংগ্রেসে রাজনৈতিক নাটক হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, আর সরকারের তহবিল ব্যবস্থাপনা অস্থিতিশীল হয়।
৪️⃣ সামাজিক সুরক্ষা খাতে চাপ:
বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বাড়ছে, ফলে Medicare, Medicaid ও Social Security খাতে ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
🌎 বৈশ্বিক প্রভাব: ডলার এখন দ্বিধার মুদ্রা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শুধু দেশীয় নয়, এটি পুরো বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। তাই ঋণ সংকটের অভিঘাত সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ছে।
- চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। তারা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকে। এখন সেই আস্থায় ধাক্কা লাগছে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মান অস্থির হয়ে পড়ছে, কারণ ঋণসীমা (Debt Ceiling) বাড়াতে দেরি হলে মার্কিন সরকারের পেমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে।
- স্টক মার্কেটে চাপ বাড়ছে— বিনিয়োগকারীরা এখন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনা, ফ্রাঙ্ক ও ইয়েনে ঝুঁকছেন।
- উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো, ডলারের শক্তিশালী অবস্থার কারণে আমদানি ব্যয়ে বিপুল চাপের মুখে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আনে, তবে “গ্লোবাল রিসেশন” বা বিশ্বমন্দার আশঙ্কা তৈরি হবে।
🏦 যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকেত
দেশটির ভেতরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালের শেষ ত্রৈমাসিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
মুদ্রাস্ফীতি এখনও ৪.২ শতাংশে,
বেকারত্ব ৫ শতাংশের কাছাকাছি,
এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ২০১৯ সালের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন —
“এই ঋণের বোঝা শুধু সরকারের নয়, সাধারণ মানুষের ঘাড়েও পড়ছে। ভবিষ্যতে কর বৃদ্ধি ও সামাজিক সুবিধা কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।”
🔍 ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ও করণীয়
Congressional Budget Office (CBO) এবং International Monetary Fund (IMF)— দুই সংস্থাই সতর্ক করেছে,
যদি ঋণ বৃদ্ধির বর্তমান ধারা চলতে থাকে, তাহলে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ $৫০ ট্রিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রস্তাবিত করণীয়:
- দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি: সাময়িক সমাধান নয়, বরং ১০-২০ বছরের “Debt Stabilization Strategy” দরকার।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো: বিশেষ করে সামরিক ও কর্পোরেট ভর্তুকি খাতে ব্যয় হ্রাস।
- কর সংস্কার: ধনী শ্রেণির জন্য ট্যাক্স সুবিধা সীমিত করে রাজস্ব বাড়ানো।
- উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো: প্রযুক্তি, কৃষি ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন আয় উৎস সৃষ্টি।
- রাজনৈতিক ঐক্য: বাজেট ও ঋণসীমা নিয়ে দলীয় টানাপোড়েন কমিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।
🕊️ একটি অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় —
সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতিও টিকে থাকতে পারে না যদি আর্থিক শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে।
৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ মানে শুধু এক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়;
এটি এক প্রজন্মের শ্রম, কর, ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের ওপর দায়ের বোঝা।
যদি এখনই যুক্তরাষ্ট্র তার ঋণনীতি পুনর্বিবেচনা না করে, তবে
“আমেরিকান ড্রিম” হয়তো একদিন বাস্তবতা থেকে ইতিহাসে পরিণত হবে।